বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি বাবদ ৬২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে অনুমোদন দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। এর আগে চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জন্য বাজেট ঘোষণাকালে বিগত সরকার এ বাবদ বরাদ্দ রেখেছিল ৪০ হাজার কোটি টাকা। আর বিগত ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বরাদ্দ দেয়া ভর্তুকির পরিমাণ ছিল ৩৫ হাজার কোটি টাকা। সে অনুযায়ী সংশোধিত বাজেটে বিদ্যুতে ভর্তুকি বাবদ বরাদ্দের পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে ২২ হাজার কোটি টাকা বা ৫৫ শতাংশ। আর বিগত অর্থবছরের চেয়ে বরাদ্দ বাড়ছে ৭৭ শতাংশ।
বিদ্যুৎ খাতে বিশেষ আইন বাতিল, বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চুক্তি পর্যালোচনা, ট্যারিফ কাঠামো সংশোধনসহ নানা উদ্যোগ নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। বিগত ছয় মাসে দেশের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন ব্যয়ও নেমে এসেছে অর্ধেকে। যদিও বিদ্যুৎ খাতের সার্বিক ব্যয়কে নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদ্যুৎ খাতের ব্যয় কমাতে সরকার নানা উদ্যোগ নিলেও বিতর্কিত চুক্তি বাতিলসহ বিদ্যুৎ খাতে প্রভাব ফেলার মতো বড় কোনো উদ্যোগ নিতে পারেনি, যে কারণে বিদ্যুতে ব্যয় কমানো যায়নি। সামনের দিনগুলোয় এ ব্যয় কমিয়ে আনতে পারার মতো কোনো লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না।
যদিও বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, এ খাতে প্রতি বছর সরকার যে পরিমাণ ভর্তুকি বরাদ্দ দেয়, অর্থ সংকটের কারণে তা নির্দিষ্ট সময়ে ছাড় করা যায় না। এর ফলে ভর্তুকির বকেয়া অর্থ পুঞ্জীভূত হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে বাড়ে প্রদেয় বকেয়ার পরিমাণও। আগের এসব বকেয়া পরিশোধ করতে গিয়ে চলতি অর্থবছরে ভর্তুকির পরিমাণও বাড়াতে হয়েছে।
বিদ্যুতে ভর্তুকি বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে প্রধানত বিগত সরকারের রেখে যাওয়া বিপুল পরিমাণ বকেয়াকেই দায়ী করছেন খাতটির নীতিনির্ধারকরা। জানতে চাইলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান গতকাল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিদ্যুৎ খাতে আমরা খরচ কমানোর চেষ্টা করছি। ভর্তুকি বাড়ার কথা যেটা বলা হচ্ছে, সেটি বিগত সরকারের রেখে যাওয়া বিপুল পরিমাণ বকেয়ার ধারাবাহিক প্রতিফলন। রেশিও হিসাব করলে কিন্তু ভর্তুকি বাড়েনি। আমরা খরচ কমানোর জন্য এরই মধ্যে নানা ধরনের উদ্যোগ নিয়েছি। বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর জ্বালানি তেল আমদানিতে সার্ভিস চার্জ ৯ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশে নামিয়েছি। ট্যারিফ নেগোসিয়েশন করছি। তবে শিগগিরই এ ফলাফল পাওয়া যাবে, বিষয়টি এমন নয়। বিদ্যুৎ খাতে অনিয়ম-দুর্নীতি সংশোধনে যেসব পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে, সেগুলোর আর্থিক ফলাফল হয়তো পরবর্তী অর্থবছরে পাওয়া যাবে।’
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সরকার আগামী তিন বছরের মধ্যে ভর্তুকির পুঞ্জীভূত বকেয়া অর্থ পরিশোধ করে দিতে চাইছে। এর সঙ্গে প্রতি বছরের জন্য বরাদ্দকৃত ভর্তুকির নিয়মিত অংশও পরিশোধের লক্ষ্য রয়েছে। এতে ভর্তুকি খাতে সরকারের ব্যয় আগের তুলনায় বাড়তে যাচ্ছে। এর মধ্যে চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির জন্য বরাদ্দ ৪০ হাজার কোটি থেকে বাড়িয়ে ৬২ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে। আর সারে ভর্তুকির বরাদ্দ ২৫ হাজার কোটি থেকে বাড়িয়ে ২৮ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে। সামনের দিনে ভর্তুকির চাপ কমিয়ে আনতে করণীয় নির্ধারণে বিদ্যুৎ বিভাগ বেশকিছু পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। তাছাড়া আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল থেকেও ভর্তুকির পুঞ্জীভূত বকেয়া পরিশোধের পাশাপাশি ভর্তুকির পরিমাণ কমিয়ে আনার পরামর্শ দেয়া হয়েছে।
দেশের চলতি অর্থবছরে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন ব্যয় বেশ কমেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে কয়লার দাম সাশ্রয়ী হওয়ায় ২০২৩ সালের জুলাই থেকে ধারাবাহিকভাবে বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় কমতে শুরু করে। ২০২৪ সালের জুনে দেশের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি ব্যয় ছিল গড়ে ৮ টাকার মতো। আন্তর্জাতিক বাজারে টনপ্রতি কয়লার দাম এখন ১০৫ ডলারের কাছাকাছি। দেশের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়ও এখন গড়ে সাড়ে ৫ টাকার কাছাকাছি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে সরকারের ব্যয় আড়াই টাকা কমায় দেশের বিদ্যুৎ খাতে বড় অংকের অর্থ সাশ্রয় হওয়ার কথা। কিন্তু সেটি হচ্ছে না।
বিপিডিবি-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মোট সক্ষমতা সাত হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু সব মিলিয়ে উৎপাদনে রয়েছে চার হাজার মেগাওয়াট। তিন হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র বসে থাকায় বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণে ব্যয়বহুল জ্বালানি তেলচালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্র ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে সাশ্রয় করা অর্থ চলে যাচ্ছে জ্বালানি তেলচালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রে। ফলে কোনোভাবেই কয়লার ব্যয় সাশ্রয় ভর্তুকির অর্থ হ্রাসে প্রভাব রাখতে পারছে না।
দেশের বিদ্যুৎ খাতের ব্যয় কমাতে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দেয়া বিশেষ বিধানের আওতায় বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ট্যারিফ পর্যালোচনার উদ্যোগ নেয় সরকার। চলতি বছরের জানুয়ারিতে এ-সংক্রান্ত একটি কমিটিও করা হয়। কিন্তু বেসরকারি এসব বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ট্যারিফ পর্যালোচনায় এখনো যথাযথ কোনো উদ্যোগ নেয়া যায়নি। যে কারণে বিদ্যুৎ খাতে ট্যারিফের ওপরেও তেমন কোনো প্রভাব দেখা যায়নি।
অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর গত বছরের ৩ অক্টোবর আদানি, সামিট, বেক্সিমকোসহ মোট ১১টি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চুক্তি পর্যালোচনার উদ্যোগ নেয়া হয়। এজন্য জাতীয় পর্যালোচনা কমিটিও গঠন করে সরকার। এ কমিটি সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ কেন্দ্রের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে বিদ্যুৎ উৎপাদন চুক্তি পর্যালোচনায় সহায়তার জন্য একটি আইনি ও তদন্তকারী সংস্থাকে দায়িত্ব দেয়ার সুপারিশ করে। গত নভেম্বরে কমিটি সুপারিশ জমা দিলেও এখনো এসব বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেয়া যায়নি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিগত সরকারের মতো বর্তমান সরকার বিদ্যুৎ খাত পরিচালনায় একই পথে হাঁটছে। যে কারণে এখানে খরচ কমানো যাচ্ছে না।
দেশের বিদ্যুৎ খাতে বিপুল পরিমাণ বকেয়া রেখে গিয়েছিল বিগত সরকার। গত বছরের জুনে এ বকেয়া পরিমাণ ছিল প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা। গত আড়াই বছর ধরে এ বকেয়া ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পায়। বিদ্যুতের বকেয়া বিল পরিশোধ করতে না পেরে আওয়ামী লীগ সরকার গত বছর থেকে বিশেষ বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে বকেয়া পরিশোধ করতে থাকে। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারও এসব বন্ড ইস্যুর বিষয়টিকে যাচাই-বাছাই না করে আওয়ামী লীগের বন্ড পরিশোধের পদ্ধতি অনুসরণ করছে।
বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩-২৪ সালে বিদ্যুতের বকেয়া পরিশোধে বিশেষ বন্ডের মাধ্যমে ২০ হাজার ১৩৩ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়। চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বরেও অন্তর্বর্তী সরকার ৫ হাজার ৫৬৩ কোটি টাকা বিদ্যুতের বকেয়া পরিশোধে বিশেষ বন্ড ইস্যু করেছে।
দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচের তুলনায় কমমূল্যে গ্রাহকের কাছে বিদ্যুৎ বিক্রি করায় প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অর্থ এ খাতে দিতে হচ্ছে সরকারকে। ২০২০-২১ অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির পরিমাণ ছিল ৮ হাজার ৯৪০ কোটি টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরে বিদ্যুতে ভর্তুকি দিতে হয় ১১ হাজার ৯৬০ কোটি টাকা। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ভর্তুকি বাবদ বরাদ্দ ছিল ২৯ হাজার ৫১১ কোটি টাকা এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বিদ্যুতে ভর্তুকি হিসেবে বরাদ্দ দেয়া হয় ৩৫ হাজার কোটি টাকা।
চলতি অর্থবছরে অন্তর্বর্তী সরকারের সংশোধিত বাজেটে বিদ্যুতে নির্ধারিত ভর্তুকির পরিমাণ অতীতের সব রেকর্ড অতিক্রম করেছে উল্লেখ করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদ্যুতে দুর্নীতি এবং কাঠামোগত বড় কোনো পরিবর্তন না আসায় বিদ্যুতে ব্যয় কমানো যাচ্ছে না। ফলে ভর্তুকির পরিমাণও বাড়াতে হচ্ছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও কনজিউমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি বিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. শামসুল আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিগত সরকারের সময়ে বিদ্যুতে যে পরিমাণ ভর্তুকি ছিল, সরকার এ খাতে সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নিলে এ ভর্তুকির পরিমাণ কমার কথা ছিল। এখন যদি ভর্তুকির পরিমাণ বেড়ে যায়, তাহলে বুঝতে হবে এ খাতে বিগত সরকারের চলমান অবৈধ ও লুণ্ঠনমূলক ব্যয় ছিল তা অব্যাহত রয়েছে। এ খাতে চুরি ও দুর্নীতি অব্যাহত রয়েছে। ব্যয় কমাতে হলে ট্যারিফ কাঠামোয় অযৌক্তিক যেসব ব্যয় রয়েছে সেগুলো কমাতে হবে। আর এসব করতে হলে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিইআরসিকে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। তারা স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে নিয়ে কীভাবে বিদ্যুৎ খাতের অযৌক্তিক ব্যয় ও ভর্তুকি থেকে বেরিয়ে আসা যায়, সেই পথ খুঁজবে। অথচ দেখা যাচ্ছে, এ খাতে বিগত সরকারের চেয়ে ব্যয় আরো বাড়িয়ে তোলা হচ্ছে।’
বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার পেছনে বিগত সময়ের বকেয়া, ঋণের সুদসহ অন্যান্য ব্যয়কে দায়ী করছেন বিপিডিবির শীর্ষ কর্মকর্তারা। তারা মনে করছেন, এ খাতে সংস্কারের মধ্য দিয়ে এ দেনা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
বিদ্যুৎ খাতে ব্যয় নিয়ন্ত্রণে না আসার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিম বণিক বার্তাকে কয়েকদিন আগে বলেছিলেন, ‘বিপিডিবি ব্যয় সাশ্রয়ী নীতি অবলম্বন করেছে। তার অংশ হিসেবে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চুক্তি পর্যালোচনা, ট্যারিফ সংশোধন, অদক্ষ বিদ্যুৎ কেন্দ্র অবসায়নসহ নানা উদ্যোগ নিয়েছে। তবে ব্যয় বাড়ার বড় কারণ হলো আগেকার থেকে যাওয়া প্রদেয় বকেয়া।’